৬৮ বছর পর ভোট দেবেন ছিটমহলবাসী

নিউজ ডেস্ক : দীর্ঘ ৬৮ বছর পর বাংলাদেশি নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পেয়েছেন বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা। নাগরিকত্ব লাভের পর বাকি ছিল ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। আগামী ৩১ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার তিন উপজেলার ছিটমহলভুক্ত ৯টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

এসব ইউনিয়ন হলো- লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট, হাতীবান্ধার গোতামারী, পাটগ্রামের বুড়িমারী, শ্রীরামপুর, জগতবেড়, কুচলীবাড়ি, জোংড়া, বাউরা ও পাটগ্রাম। তবে হাইকোর্টে হওয়া এক রিট আবেদনের পরিপেক্ষিতে পাটগ্রামের বাউরায় তফসিল স্থগিত করা হয়েছে।

ভোটের কারণে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। আনন্দে ভাসছেন বাংলাদেশের নতুন এই নাগরিকরা। উৎসবের আনন্দে চলছে প্রচার-প্রচারণা। এ যেন ঈদের আনন্দ, এ যেন দুর্গাপূজার আনন্দ। ভোটের আলাপন, রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে, হাটে-ঘাটে-মাঠে শুধু ভোট আর ভোট।

‘যোগ্য প্রার্থীর বিকল্প নাই, নতুন বাংলাদেশিদের উন্নয়ন চাই’ মাইকে ধ্বনিত হচ্ছে এমন স্লোগান। শিশুরা পোস্টার হাতে রাস্তায় হৈ-হুল্লোর করছে। ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রচারণার তৎপরতা ততোই বেড়ে যাচ্ছে।

কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে প্রচার-প্রচারণা। এছাড়া পোস্টার ও ব্যানারে ছেঁয়ে গেছে পুরো এলাকা। প্রার্থীরা কর্মীবৈঠক ও উঠান বৈঠক করছেন।

কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন। প্রার্থীরা বিলুপ্ত ছিটের বাসিন্দাদের জীবনমান উন্নয়নে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। ভোটাররাও হিসাব কষছেন আগামী ৫ বছর সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকবেন এরকম প্রার্থী নির্বাচন করার।

বছরের পর বছর তারা ভোট দেখেছেন কিন্তু দিতে পারেননি। এবার তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। শুধু ভোট দিয়ে পছন্দের প্রার্থী বেছে নেওয়াই নয়, সাবেক তিন ছিটমহলবাসী নিজেরা প্রার্থীও হয়েছেন।

তাদের একজন ছিটমহল বিনিময়ের সাবেক নেতা আজিজুল ইসলাম, যিনি হাতীবান্ধার গোতামারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন সাধারণ সদস্য প্রার্থী হিসেবে। পাটগ্রামের বিলুপ্ত ১১৬ নম্বর ভোটবাড়ির বাসিন্দা মোজাহারুল ইসলাম পাতু এবং ১১৭ নম্বর বিলুপ্ত ভোটবাড়ি ছিটের বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকও সাধারণ সদস্য প্রার্থী হিসেবে নেমেছেন ভোটযুদ্ধে। তারা উপজেলা শ্রীরামপুর ইউনিয়নের যথাক্রমে ১ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচন করছেন।

নির্বাচন নিয়ে আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘জিতব না হারবো সেটা পরের কথা। তবে প্রথম ভোটার হওয়ার পাশাপাশি প্রার্থী হওয়ায় আমার আনন্দটা যেন আরও বেশি’। একই কথা বলেন, মোজাহারুল ইসলাম পাতু ও আবু বক্কর সিদ্দিকও।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভোট হচ্ছে এমন ইউনিয়নগুলোতে চলছে উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন প্রার্থীর শত শত পোস্টার ঝুলছে গ্রামগঞ্জের বাজার, হাট বা বিভিন্ন সড়কে। আর ছিটমহলবাসীরা যুক্ত হওয়ায় এবার ওইসব এলাকা যেন বর্ণিল হয়ে উঠছে। সদ্য বাংলাদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীরা নিজেদের পিছিয়ে পড়া এলাকাগুলোর উন্নয়নে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে একদিকে যেমন চুলচেড়া বিশ্লেষণ করছেন, তেমনি প্রার্থীরাও ওইসব মানুষের উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার করছেন গণসংযোগ বা উঠান বৈঠকে।

হাতীবান্ধার উত্তর গোতামারীর বাসিন্দা (সাবেক ছিটবাসী) বৃদ্ধ ছকবর আলী বলেন, ‘এবার আমরা বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে মূল্যবান ভোট দিতে পারবো। ফলে জীবনের শেষ সময়ে হলেও এ সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত।’

একই এলাকার আমেনা বেগম বলেন, ‘ছোট থেকে বৃদ্ধ হয়েছি ঠিকই কিন্তু কোনোদিন ভোট দিতে পারিনি। এবার ভোট দিতে পারবো বলে আমরা অনেক খুশি।’

বাঁশকাটা ১১২ সাবেক ছিটের অধিবাসী পাটগ্রাম আদর্শ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ শাহ্ কামাল বলেন, ‘আমরা ছিটবাসী বিশৃঙ্খলা চাই না। শান্তিপূর্ণ, অবাধ, নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হোক, এটাই চাই। দলমত বুঝি না, যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিয়ে এলাকার উন্নয়ন ঘটাতে চাই।’

একই কথা বলেন পাটগ্রামের বাঁশকাটা গ্রামের শিল্পী আক্তার ও জোংরা ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের নতুন ভোটার সজিজুল ইসলামও।

পাটগ্রামের বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবু সাইদ নেওয়াজ নিশাত (স্বতন্ত্র) বলেন, ‘অবশ্যই অবশ্যই, আলাদা নজর থাকবে বঞ্চিত ওই মানুষগুলোর জন্য।’ প্রায় একইরকম কথা বলেন জোংরা ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সুধীর চন্দ্র রায় ও নৌকা প্রতীকের আশরাফ আলী মিয়া।

ভোট নিয়ে লালমনিরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ফজলুল করিম জানান, ইতোমধ্যে ভোটের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। কোথাও যেন কোন ঝামেলা না হয় সেদিক নজর রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এসএম রশিদুল হক জানান, কোথাও যেন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সেদিকে ভালোভাবে খেয়াল রাখা হচ্ছে। নির্বাচনে কেউ ঝামেলা করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবুল ফয়েজ মোহাম্মদ অলাউদ্দিন খাঁন জানান, বিশেষ মনিটরিং করে নির্বাচনের সব খবর নেওয়া হচ্ছে। আমি এ জেলার সব প্রার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। আশা করি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকরের মাধ্যমে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দি জীবনের মুক্তি মিলে ভারত বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহলের কয়েক হাজার মানুষের। যার মধ্যে ১১১টি বাংলাদেশের এবং বাকি ৫১টি ভারতের ভুখণ্ডের সাথে যুক্ত হয়। এগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলায় ১২টি, লালমনিরহাট জেলায় ৫৯টি, পঞ্চগড় জেলায় ৩৬টি এবং নীলফামারীতে রয়েছে ৪টি।

লালমনিরহাটের ৫৯টি ছিটমহলের মধ্যে সদর উপজেলায় ২টি, হাতীবান্ধা উপজেলায় ২টি ও পাটগ্রাম উপজেলায় ৫৫টি অবস্থিত। পাটগ্রামের ৫৫টির মধ্যে ১৭টি ছিটমহল জনবসতিশূন্য।

Pin It

Comments are closed.