সুসজ্জিত করা হয়েছে রংপুরের তাজহাট জমিদার বাড়ি জাদুঘর

দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণে সুসজ্জিত করে তোলা হয়েছে তাজহাট জমিদার বাড়ি রংপুর জাদুঘর। আর এর মধ্যে দিয়েই মহানগরীর উপকণ্ঠে মাহিগঞ্জ এলাকায় অনেকটা নিরিবিলি পরিবেশে বিশাল আয়তনের ঐতিহাসিক তাজহাট জমিদার বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত রংপুর জাদুঘর ফিরে পেয়েছে তার হারানো ঐতিহ্য। রংপুর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা নারী-পুরুষ ও শিশুদের পদচারণায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুখরিত থাকছে জাদুঘর এলাকা। দিন দিন বেড়েই চলেছে দর্শনার্থীদের সংখ্যা। ঐতিহাসিক এই তাজহাট জমিদার বাড়ির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে মানুষ। দর্শণার্থীদের উপচেপড়া ভিড়ের ফলে রাজস্ব আয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুধুমাত্র প্রবেশ মূল্য থেকেই আয় হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া জুলাই থেকে ১৫ আগষ্ট পর্যন্ত আয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা।

এদিকে তাজহাট জমিদার বাড়িতে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ শিশু ও প্রতিবন্ধীদের বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন সম্পর্কে যেন শিক্ষার্থীরা জানতে পারে সে জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এ ব্যাপারে জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মোঃ আবু সাইদ ইনাম তানভিরুল বলেন, দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করতেই জমিদার বাড়িটিকে অপরূপ রূপে সাজানো হয়েছে। জমিদার বাড়ির সামনে তৈরি করা হয়েছে ফুলের বাগান ও রাস্তা। দর্শনার্থীদের বসার জন্য জাদুঘর চত্বর জুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে আসন। খোলা হয়েছে মন্তব্য বই। তিনি আরও জানান, দর্শনার্থীদের যাতে কোনো প্রকার সমস্যা না হয় সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিন পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। সম্প্রতি ভারত, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং পর্যটকরা জাদুঘর পরিদর্শনে এসে জমিদার বাড়ির এ অপরূপ পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন বলে জানান তিনি।

জানা যায়, মহানগরীর মাহিগঞ্জ তাজহাট এলাকায় রংপুরের প্রজাহিতৈষী জমিদার গোবিন্দ লাল রায়ের পুত্র গোপাল লাল রায়ের নির্মিত জমিদার বাড়িটি প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করা হয় ১৯০৮ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে। সে সময় এটি স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৪৭ সালে জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। তখন ৫৫ একর জমিসহ মূল ভবনটি এগ্রিকালচার ইনস্টিটিউটকে দেওয়া হয়। সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে জমিদার বাড়ির মূল ভবনসহ ১৫ একর জায়গা দেওয়া হয় হাইকোর্ট ডিভিশনকে। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ উঠে গেলে ১৯৯৫ সালে তাজহাট জমিদার বাড়িকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে ন্যস্ত করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২০ মার্চ স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরি চত্বর থেকে রংপুর জাদুঘরটিকে মাহিগঞ্জ তাজহাট জমিদার বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। আনুষ্ঠানিক ভাবে জাদুঘরের উদ্বোধন করেন তত্কালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান। সে সময় তিনি ঘোষণা দেন, তাজহাট জাদুঘরটিসহ ওই এলাকাকে একটি আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এজন্য প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই ঘোষণা পরবর্তীতে শুধু আশ্বাসেই পরিণত হয়। বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন হয়নি।

এদিকে জাদুঘরটি স্থানান্তরের পর এখানকার দুর্লভ প্রত্নসম্পদ দেখার জন্য দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে কয়েকগুণ। জাদুঘরে রয়েছে মহামূল্যবান কষ্টি ও শিলামূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, শিবলিঙ্গ, ছোট কোরআন শরিফ, প্রাচীন মুদ্রাসহ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ প্রকারের প্রত্নসম্পদ। জমিদার বাড়ি সূত্রে জানা যায়, দেশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি ২০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২শ’ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শুধুমাত্র প্রবেশ মূল্য থেকেই রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। দিন দিন বেড়েই চলেছে দর্শনার্থীদের সংখ্যা। দর্শনার্থীদের মতে, প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরে এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের বেশকিছু নিদর্শন রয়েছে। এই জাদুঘর ভবিষ্যত্ প্রজম্মকে রংপুর অঞ্চলের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে পরিচিত করে দিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। তবে এ অবস্থায় অনেকেই জাদুঘরের পাশাপাশি এখানে পর্যটন ও পিকনিক স্পট গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মতপ্রকাশ করেন। তাদের মতে, এখানে পর্যটন ও পিকনিক স্পট গড়ে তোলা হলে শুধু দেশি নয় বিদেশি পর্যটকরাও আকৃষ্ট হবে। এতে এ অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এ অঞ্চলের বেকারত্বের হার কমে যাবে। তারা তাজহাট জমিদার বাড়িতে ক্যান্টিন, গ্যারেজ, পর্যাপ্ত আলো, ল্যাট্রিন ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থারও দাবি জানান।

Pin It

Comments are closed.