সাইনবোর্ডের ব্যয় অর্ধকোটি, প্রকল্পে কত?

খোরশেদ আলম সাগর :: লালমনিরহাটের অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কর্মসৃজন প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থই লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, শুধুমাত্র ভাউচার বানিয়ে জায়েজ করা হয়েছে লাখ লাখ টাকা।

অভিযোগকারীদের সূত্রে জানা গেছে, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকার সারাদেশে কর্মসৃজন প্রকল্পে ৪০ দিনের কর্মসূচি চালু করে। যার আওতায় লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলায় দু’টি পর্যায়ে মোট ৮০ কর্মদিবসে ছিন্নমুল শ্রমিকরা রাস্তা ঘাট, খেলার মাঠ, বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাঠে মাটি ভরাটের কাজ করেন। দৈনিক ২০০ টাকা মজুরিতে সাধারণ শ্রমিকরা এবং ২৫০ টাকা মজুরিতে সর্দাররা কাজের সুযোগ পান।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় দুই পর্যায়ে ৫৫৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৪ কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যার মধ্যে আট হাজার ৭৪৭ জন সাধারণ শ্রমিকের মজুরি ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ৫২ হাজার ও ৫৫৮ জন শ্রমিক সর্দারের মজুরি ধরা হয়েছে ১৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। এসব প্রকল্পে একটি করে সাইনবোর্ড সাটানোর জন্য আলাদাভাবে ৭৭ লাখ ৩৯ হাজার ১৯৫ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়।

প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একটি সাইনবোর্ড সাটানো বাধ্যতামূলক। এসব সাইনবোর্ড তৈরির ভাউচারে লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলায় বিস্তর ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। কাঠের ফ্রেমে প্রতিটি ডিজিটাল সাইনবোর্ড তৈরিতে পাটগ্রাম উপজেলায় খরচ দেখানো হয়েছে সাতশ’ টাকা। ওই একই সাইনবোর্ড তৈরিতে সদর ও আদিতমারীতে দুই হাজার ৯৫০ টাকা এবং কালীগঞ্জ উপজেলায় দুই হাজার ৮৫০ টাকার খরচ দেখানো হয়েছে। আর হাতিবান্ধা উপজেলা থেকে এ ব্যাপারে তথ্য দিতে রাজি হয়নি, তবে নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করেছে, তারাও দুই হাজার ৮৫০ টাকা খরচ দেখিয়েছে প্রতিটি সাইনবোর্ড তৈরিতে। একই জেলায় সাইনবোর্ড তৈরির খরচের এমন ব্যবধান লুটপাটেরই ইঙ্গিত বহন করে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাইনবোর্ডের আট হাজার একশ’ টাকা ফেরত পাঠালেও অন্য উপজেলার এমন তথ্য নেই জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ে। অর্থ বছর শেষ হওয়ায় প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়সহ ঊর্ধ্বতন দফতরে পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কমিটি।

শুধু তাই নয়, মোট ৫৫৮টি প্রকল্পে ৫৫৮ জন প্রকল্প চেয়ারম্যানের আনুষঙ্গিক খরচের জন্য দুই হাজার টাকা (ভ্যাটসহ) করে বরাদ্দ থাকলেও কেউ কেউ আংশিক পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ কোনো টাকাই পাননি। এর মধ্যে আদিতমারীতে এক হাজার করে দিয়ে প্রকল্প চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষর নেয়া হয় দুই হাজারের। সদর উপজেলায় লোক বুঝে কাউকে পাঁচশ’, কাউকে এক হাজার দিয়ে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যারা টাকা পাননি, তারা অন্য সুবিধা গ্রহণের প্রতিশ্রুতিতে স্বাক্ষর করেছেন। টাকা বঞ্চিতরা নাম প্রকাশ করতে রাজি নন।

প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস কাগজে কলমে ঠিক রেখে লোপাট করেছে এসব অর্থ- অভিযোগ এমনই। ইউনিয়ন কমিটির খরচ দেখানো হলেও বাস্তবে ইউনিয়ন কমিটি কোনো খরচ পায় না বলে দাবি করেছেন একাধিক জনপ্রতিনিধি।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য ও জনপ্রতিনিধি জানান, জেলার পাঁচ উপজেলায় শুধুমাত্র সাইনবোর্ড ও তার ভাউচার মিলালে বেড়িয়ে আসবে এ প্রকল্পের লুটপাটের তথ্য। তারা এর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাশেদুল ইসলাম জানান, তার উপজেলার ১১৪টি প্রকল্পে ১১৪টি সাইনবোর্ড তৈরি করা হয়েছে। যার প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে দুই হাজার ৮৫০ টাকা। প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল তাই খরচ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, ইউনিয়ন কমিটিকে খরচ দিলেও তারা শ্রমিকদের হাজিরা বইসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি প্রস্তুত রাখেন না। তাই এ বছর ইউনিয়ন কমিটিকে কোনো খরচ করতে দেয়া হয়নি।

জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার সুজা উদ দৌলা জানান, বিষয়টি তার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Pin It

Comments are closed.