শতবর্ষ : রংপুরের বাতিঘর কারমাইকেল কলেজ

IMG_২০১৬০৭৩১_০৪১৮৪৪
বৃহত্তর রংপুরের বাতিঘরতুল্য বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজ। প্রতিষ্ঠাকাল বিবেচনায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রবর্তী শতবর্ষী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাই উত্তরবঙ্গের অক্সফোর্ড হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। অবশ্য এ অভিধার আরেকটি কারণ হতে পারে ইন্দো স্যারাসিনিক স্টাইলে নির্মিত কলেজ ভবন, যা অনেকাংশে অক্সফোর্ড ভিলেজ–সদৃশ।

‘শতবর্ষে শতপ্রাণ, ঐতিহ্যের জয়গান’ স্লোগানে কারমাইকেল কলেজ পূর্ণ করতে চলেছে গৌরবের পথচলায় এক শতাব্দী। কিংবদন্তির জনপদ রংপুর। মহাভারতে বর্ণিত রাজা বিরাট ও তাঁর শাসিত মত্স্যদেশ-সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাগৈতিহাসিক রংপুর বরাবরই আলোচিত। ঐতিহ্যের জয়গানে কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বর্ণাঢ্য, অংশত চমকপ্রদ।

রংপুরে স্থানীয় প্রজাবত্সল ভূস্বামীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্কুলে পঠন-পাঠনের সুযোগ ছিল অবারিত। সে কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে এ জনপদের মানুষ বেশ এগিয়ে ছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ ছিল অনেকটা সীমিত। বিদ্যোত্সাহী শিক্ষার্থীদের কেউ পড়ালেখার জন্য দূরবর্তী কুচবিহার কলেজে যেত। উনিশ শতকের শেষ দিকে রংপুর জিলা স্কুলে কলেজ সেকশন খোলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ হয়ে যায়। এ অঞ্চলে একটি মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠা ছিল রংপুরবাসীর আজন্মলালিত স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন সারথিদের মধ্যে অগ্রগামী কুণ্ডীর জমিদার মৃত্যুঞ্জয় রায়চৌধুরী। তৎকালীন রঙ্গপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ১২৫ বিঘা জমি দান করেছিলেন, কিন্তু তখন সরকারি অনুদান মেলেনি।

১৯১৩ সালে অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড ব্যারন কারমাইকেল রংপুর পরিদর্শনকালে তাঁর সংবর্ধনা সভায় রংপুরে কলেজ স্থাপনের দাবি উত্থাপন করা হয়। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অক্ষমতার কথা জানান গভর্নর কারমাইকেল। কলেজ প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে একটি রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দিয়ে রংপুর ছাড়েন তিনি। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে পাঠানো ডিপিআই রিপোর্টে কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত জানানোর অনুরোধ করা হয়। উপস্থাপিত রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি সম্পূরক চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। রিপোর্ট ও চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৩ আগস্ট সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। স্থানীয় উদ্যোগে তিন লাখ টাকা সংস্থানের শর্তে অনুমতির আশ্বাস মেলে।

১৯১৪ সালের মধ্যেই রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর জমিদার এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের দানে সংগৃহীত মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় চার লাখ টাকা। কলেজ নির্মাণে নির্দেশিত অর্থ সংগ্রহের জন্য অনুষ্ঠিত বৈঠকে একটি ঘটনা কিংবদন্তি হয়ে আছে। বলা হয়ে থাকে, টেপার জমিদার অন্নদামোহন রায়চৌধুরী তাঁর প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ লেখার সময় অসাবধানতাবশত একটি শূন্য বেশি লিখে ফেলেছিলেন। ফলে তাঁর নির্ধারিত চাঁদা ১০ হাজার টাকার স্থলে এক লাখ টাকা হয়েছিল। অন্নদামোহন রায়চৌধুরী এক লাখ টাকাই দিয়েছিলেন। তাজহাটের মহারাজা গোপাল লাল রায় দিয়েছিলেন এক লাখ টাকা। কারও কারও মতে, জমিদার অন্নদামোহনের কাছে হারতে চাননি মহারাজা গোপাল লাল। তাই তিনিও এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন। আসলে দানের প্রতিযোগিতায় হারেননি কেউই। সব মিলিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা চাঁদা উঠেছিল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য। একটি নামফলকে দাতাদের মধ্যে ২৮ জনের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

কুণ্ডীর জমিদারদের অসামান্য দানে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সম্পূর্ণ হয়েছিল। কুণ্ডীর জমিদার সুরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ও মণীন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয়ের ৪১৯ বিঘা এবং কুণ্ডী জমিদারির অন্য শরিক মৃত্যুঞ্জয় রায়চৌধুরীর ৪২৫ বিঘা, সব মিলিয়ে প্রায় ৯০০ বিঘা জমি পাওয়া গিয়েছিল কলেজের জন্য। ১৯১৬ সালের ১০ নভেম্বর লর্ড কারমাইকেল আবার এলেন রংপুরে। শহরের কেন্দ্র থেকে পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণে তিনি রংপুরবাসীর স্বপ্নকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। তাঁর নামেই কলেজের নামকরণ করা হলো ‘কারমাইকেল কলেজ’।

কলেজ প্রতিষ্ঠার পুরো প্রক্রিয়া তদারক ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ১১ সদস্যবিশিষ্ট গভর্নিং বডি ‘কমিটি অব দ্য কারমাইকেল কলেজ’। রংপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জে এন গুপ্ত সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কলেজ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। এর আগে প্রায় দুই বছর রংপুর জেলা পরিষদ ভবনে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম চলেছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; ১৯৪৭-৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৫৩ থেকে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল কলেজটি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এ কলেজে বর্তমানে ১৮টি বিভাগ, শিক্ষকের সংখ্যা ১৮৩ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে কারমাইকেল কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের আশ্বাস ছিল। ২০০৬ সালে জাতীয় সংসদে ‘রংপুর কারমাইকেল কলেজ আইন, ২০০৬’ পাস হয়। ১১ অক্টোবর সরকারি গেজেট ঘোষণার পরে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে রূপান্তরের প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি। বরং কারমাইকেল কলেজের অধিকৃত জমিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

শতাব্দী পরিক্রমায় প্রথম অধ্যক্ষ জার্মান নাগরিক ড. ওয়াটকিনসের স্থলাভিষিক্ত হন রংপুরের কৃতী সন্তান বর্তমান অধ্যক্ষ বিনতে হুসাইন নাসরিন বানু। কলেজ কর্তৃপক্ষ আগামী নভেম্বর মাসের ৪-৫ তারিখে অনুষ্ঠেয় শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান সাফল্যমণ্ডিত করতে নিরলস কাজ করছে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণেচ্ছু সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনলাইনে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া গত মে মাসের ৪ তারিখে শুরু হয়েছে, চলবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর শিক্ষক ডি এন মল্লিক কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। সন্জীদা খাতুন অধ্যাপনা করেছেন বাংলা বিভাগে। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী এ কলেজে পড়ালেখা করেছেন। শহীদজননী জাহানারা ইমাম, জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক কারমাইকেল কলেজের ছাত্র। বাংলাদেশ গণপরিষদের প্রথম স্পিকার গাইবান্ধার কৃতী সন্তান শাহ্ আবদুল হামিদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং প্রথম প্রধান বিচারপতি সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপিও কারমাইকেল কলেজেরই ছাত্র।

শতবর্ষ পূর্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছে কারমাইকেলের সবুজ প্রাঙ্গণ।

 
মতিয়ার রহমান: সহকারী অধ্যাপক, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর।

Pin It

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।