লালমনিরহাটের ছেলের সিঙ্গাপুরে নির্মাণশ্রমিক থেকে কবি হয়ে ওঠার গল্প

নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ২০০৮ সালে সিঙ্গাপুর যান লালমনিরহাটের ছেলে মো. মুকুল হোসেন। কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও প্রবাসে একাকিত্ব কাটাতে তাঁর মধ্যে জেগে ওঠে কবি সত্তা। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কাজ থেকে ফিরে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে যান, রাত জেগে কবিতা লেখেন, সাদা কাগজ না পেয়ে সিমেন্টের বস্তাই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার খেরোখাতা। তিন মাস আগে সিঙ্গাপুরে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ মি মাইগ্র্যান্ট। সিঙ্গাপুরে তো বটেই, আরও কয়েকটি দেশের গণমাধ্যমে উঠে এসেছে এ খবর। নির্মাণশ্রমিক থেকে কবি হয়ে ওঠার গল্পটা মো. মুকুল হোসেন নিজেই লিখেছেন পাঠকদের জন্য।

পাড়াগাঁয়ে আমার জন্ম। সবার সঙ্গে হইহুল্লোড় করে বড় হয়েছি। ছোটবেলায় অনেক কষ্ট করেছি, ধুঁকে ধুঁকে বড় হয়েছি। তবে আমার বন্ধুদের মধ্যে আমি মনে হয় একটু আলাদাই ছিলাম।

ছোটবেলায় যখন স্কুলে গান করতাম, তখন অন্যদের হাততালি ছিল আমার প্রেরণা। ভালো গান করতে পারতাম না, তবে চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার গান করা শুরু। প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, কলেজসহ বিভিন্ন জায়গায় গান করতাম। গান করতে করতে হঠাৎ গান লেখার একটা ভূত মাথায় চাপল। দু-একটা গান লিখলে, বড় বোন দেখত। বোন বলত, ‘মুকুল, এগুলো গান ঠিক আছে, কিন্তু কবিতা হলে ভালো হতো।’

.স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত আছেন মো. মুকুল হোসেন। আর এসব সংগঠন অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবাসহ অধিকার নিয়ে কাজ করে। তেমনই একটি উদ্যোগে কাপড় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিতরণ করছেন

এক দিন, দুদিন করে হঠাৎ একটা ম্যাগাজিন স্বাধীন-এ আমার একটা লেখা দিলাম। ছাপাও হলো সেটা। তখন থেকে আমার কবিতা লেখা শুরু। নিজের কাছে মনে হতে শুরু করল আমাকে একটা কিছু করতে হবে। পড়ালেখার ফাঁকে কবিতা, গল্প, উপন্যাস লিখতাম। ২০০৮ সালে আমার প্রবাসজীবন শুরু হলো। এলাম সিঙ্গাপুরে। প্রবাসে যখন অনেক কষ্ট হতো, অনেকের অনেক কথা শুনতে হতো। তখন মনটা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে যেত, কবিতা আমার কাছে এসে ধরা দিত। কবিতা ভালোবাসা হয়ে আসত হৃদয়ে ছন্দ হয়ে, তাল হয়ে, লয় হয়ে।
সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত একটি চীনা ভাষার পত্রিকা মো. মুকুল হোসেনকে নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেসিঙ্গাপুরের কবিদের ভিড়ে মাঝেমধ্যে কবিতা পড়ার সুযোগ হতো এবং সিঙ্গাপুরে একমাত্র বাংলা পত্রিকা বাংলার কণ্ঠ-এ লিখতাম। সিঙ্গাপুরের অনেক কবি আমার লেখা দেখে খুশি হতেন। আমাকে অনুপ্রেরণা জোগাতেন, সাহস দিতেন। আমার একটা-দুটা করে কবিতা তাঁদের পাঠাতাম, খুব খুশি হতেন। একটা সময়ে মি. সিরিল অং আমার পাশে দাঁড়ালেন বন্ধু হয়ে। তাঁর ভালোবাসা ও মমতা আমাকে কবিতা লিখতে উৎসাহ জোগাল। বেশি বেশি কবিতা লিখতে শুরু করলাম। নতুন করে সাজাতে শুরু করলাম আমার লেখালেখির জীবনটাকে।

প্রবাসের বন্দী শ্রমজীবন থেকে প্রতিদিন অনেক কষ্ট, যন্ত্রণা সহ্য করেছি, করতে হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। সারা দিন পরিশ্রম করে সবাই যখন বিশ্রামে যায়, তখন এখানে-সেখানে বিভিন্ন ইংরেজি কবিদের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কিংবা কবিতা-সন্ধ্যায় যেতাম। রাত জেগে কবিতা লিখতাম, অনুষ্ঠান থেকে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত ১২টা বা ১টা বেজে যেত। কোনো কোনো দিন খাওয়ার সময়টুকুও পেতাম না। না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম। রাত জেগে কবিতা লিখতাম, অনেকে হাসাহাসি করত। কাগজ না পেয়ে অনেক দিনই সিমেন্টের ব্যাগের কাগজে কবিতা লিখেছি। আবার সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে উঠতাম কাজের জন্য। জীবনে অনেক ইচ্ছা ছিল, যেগুলো আমার দ্বারা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সব সময় ভাবনা ছিল কবে একটা নতুন কিছু সৃষ্টি করে সবার কাছে তুলে ধরব। আমি যেটা ভেবেছি বা করেছি, সেটা শুধু পরিবারের জন্য না, বাবা-মায়ের জন্য না, গোটা বাংলাদেশের জন্য। আমার চেষ্টা ছিল এবং ছিল বিশ্বাস।

আজ সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন কবি, সাংবাদিক, ছাত্রছাত্রী বা সাহিত্যমনা মানুষের মাধ্যমে তা সার্থক করতে পেরেছি। সবার সহযোগিতা পেয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি। আমি অনেক কোয়ালিফায়েড না, আমার যোগ্যতা নেই, কিন্তু আমার ইচ্ছাটা আছে। আমি সব সময় কবিতার মধ্যে ভিন্ন কিছু করে দেখাতে চাই এবং আমাকে করতে হবে। সবার অন্তরে থাকতে চাই কবিতা হয়ে—এটা ছিল আমার প্রত্যাশা। আমি অনেক ক্ষুদ্র মানুষ। নিজেকে কোনো সময় লেখক বা কবি দাবি করি না, করতেও চাই না। আমি আমার ইচ্ছা, ভাবনা, কষ্টগুলো কলমের কালিতে সাদা কাগজে বা মোবাইল ফোনে টাইপ করে নিজের একাকিত্ব থেকে দূরে থাকতে চাই এবং কিছু বন্ধুকে সঙ্গে রাখি। সে জন্য আমার লেখালেখি।
সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও এখন ডাক পড়ে মুকুল হোসেনেরসিঙ্গাপুরে যখন আমার ইংরেজি কবিতার বই মি মাইগ্র্যান্ট প্রকাশিত হলো পুরোনো সংসদ ভবনে, তখন সে দেশের নামীদামি লেখক, কবিরা ছিলেন আমার অনুষ্ঠানের মধ্যমণি। আমি অনেক খুশি হয়েছি সেদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনার মাহবুব উদ্ জামানকে কাছে পেয়ে। বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের পরে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য যখন দেড় শতাধিক ভিআইপি বা বড় লেখক অপেক্ষা করছিলেন, তখন নিজেকে সামলাতে পারিনি। চোখ বেয়ে ঝরছিল বৃষ্টি। পরিবারের কথা তখন খুব মনে পড়েছিল। মায়ের কথা খুব মনে পড়েছিল সেদিন। অনেক মানুষের কাছ থেকে উপহার ও ফুল পেয়ে অনেক অনেক খুশি হয়েছি। বেশি খুশি হয়েছি যখন সিঙ্গাপুরের জাতীয় পত্রিকাগুলো আমাকে নিয়ে লিখছিল, সংবাদ প্রকাশ করছিল। সিঙ্গাপুরের চ্যানেল নিউজ এশিয়াতে সরাসরি অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য চ্যানেলে নানা সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে ফোন, ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ ইনবক্সে সবার অনুপ্রেরণা, ভালোবাসা আমাকে মোহিত করে তুলেছিল। কোনো দিন ভাবতে পারিনি আমি এত কিছু করতে পারব।

গত মে-জুন মাসে আমার বইয়ের প্রথম মুদ্রণের দেড় হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। দ্বিতীয় মুদ্রণ হয়েছে জুলাই মাসে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ বইয়ের দোকানগুলো আমাকে আমন্ত্রণ জানায় কিছু বলার জন্য। আমি একজন শ্রমিক বা দিনমজুর, এক দিন কাজ না করলে সিঙ্গাপুরে সমস্যা। তবুও সাহিত্যের জন্য, আমার কবিতার জন্য, দেশের জন্য অনেকের অনুরোধে মাঝেমধ্যে হাফ ডে কাজ করে অনুষ্ঠানে সময় দিচ্ছি। এতে হাত পেতে ছুটি নিতে হয়েছে এবং শুনতে হয়েছে অপমানজনক কথাও। কিন্তু আমি আমার মতো লজ্জা ত্যাগ করে ছুটে চলেছি জীবনের তাগিদে—শুধু আমার স্বপ্নপূরণের আশায়। আমার খুব ভালো লাগে সিঙ্গাপুরে ১ লাখ ৬০ হাজার বাংলাদেশি ভাইয়ের মধ্যে আমি সামান্য কিছু করতে পেরেছি। আমার অনেক ইচ্ছা, আমি আমার মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাব। সবার অন্তরে, কবিতার মাঝে থাকব।

একনজরে
মো. মুকুল হোসেন ১৯৮৯ সালের ২৮ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার পানবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আলহাজ মো. কফিল উদ্দিন সিপাহী ও কুলছুম বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে মুকুল সপ্তম। পড়াশোনার পাঠ শুরু গ্রামের স্কুলেই। এরপর পাটগ্রামের সরকারি জসমুদ্দিন কাজী আবদুল গনি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ২০০৮ সালে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুরে।
মি মাইগ্রেন্ট বইয়ের আগে বাংলাদেশে তাঁর দুটি বই প্রকাশিত হয়েছে। দুঃখের সীমানায় সুখ নামে একটি উপন্যাস ও অপূর্ণ বাসনা নামে একটি কবিতার বই। এ ছাড়া যৌথভাবে প্রকাশিত আরও পাঁচটি কবিতার বইয়ে কবিতা রয়েছে মুকুলের।

Pin It

Comments are closed.