‘যার ঘর ভাসি গেইছে, তার আবার ঈদ’

‘টাকা নাই, ঘরত খাবার নাই। কয়েক মাস ধরি, রিলিফের চাউল দিয়া চলিছি। মাইনসের জায়গাত আছি। যার জমি জায়গায়, ঘর বানের পানিত ভাসি গেইছে তার আবার ঈদ।’

ভরাট তিস্তা নদীর ওপর ডুবন্ত সূর্যের লাল আভা। সন্ধ্যা হওয়ার অল্প সময় বাকি। নদীর পাশেই তিস্তার আগ্রাসনে সর্বশান্ত হওয়া বানভাসিদের আশ্রয়কেন্দ্র। কোরবানি ঈদের আগে দিন সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) আশ্রয়কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে এ কথা বলেন তিস্তা পাড়ের বানভাসি রোকেয়া।

লালমনিরহাট হাতিবান্দা উপজেলার দোয়ানি ইউনিয়নের এই আশ্রয়কেন্দ্রে রোকেয়ার মতো কয়েক হাজার বানভাসি মানুষ সব খুইয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন।

আশ্রয়কেন্দ্রে বানভাসি রোকেয়া, আমেনা, ফাহিমা, শরীফা ও আসাদুলদের সঙ্গে কথা হয়। বন্যায় তাদের ঘর-বাড়ি, সারা বছরের সঞ্চিত ধান-চাল তিস্তার পানিতে মিশে গেছে। সেই সঙ্গে বন্যার পানিতে তছনছ হয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন। এখন সময় কাটে কখন রিলিফের চাল আসে এই অপেক্ষায়। এমন অবস্থায় তাদের কাছে ঈদে একটু ভালো খাওয়া অলীক স্বপ্নের মতো।

ডিমলা উপজেলার চর খড়বাড়িতে স্ত্রী সন্তান নিয়ে নিজের বাড়িতে থাকতেন আসাদুল। বন্যা শুরু হলে ঘর, ফসলের খেত, বিছানা পাটি ও ছাগলসহ সব ভেসে যায় তিস্তায়। কোনো রকমে বউ-বাচ্চা নিয়ে দোয়ানির এই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেন তিনি।

আসাদুল বলেন, ‘চাইরদিন আগোত ১০ কেজি রিলিফের চাউল দিয়া গ্যাছে। ওইলা আছে ভাত আন্দোমো খামু। ঈদের দিনোত আর কিছু করার নাই, জীবন বাঁচে না বাহে, আর ঈদের কতা কন।’

গত বছরের ঈদের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘এই বছরের মতো বান আর হয় নাই। গতবার পাঁচ ঘর মিলি গরু জবাই করছিনো, এবার হাফ কেজি ব্রয়লার মুরগির কেনার পাইসা নাই।’

‘ছোয়ালার (ছেলেমেয়ে) দিকিত দেখবার পাওছো না’ বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আসাদুল।

‘তিস্তা হামাক খাইলো বাহে’ উত্তাল তিস্তার পানে তাকিয়ে এ কথা বলে উঠেন স্বামীহারা আমেনা। তিন মেয়ে সন্তানের এই মা বলেন, ‘কোনদিন বা এটে (আশ্রয় কেন্দ্র) থাকি উঠি যাবার কয়। পানি যে কোনদিন শুকাইবে কবার পাই না। শুকাইলে কি যাওয়া যাইবে। কিচ্ছু নাই সব বানত ভাসি গেইছে।’

‘হামার বেটা এক বছর হইল মারা গেইছে, ওমার সময় ছাগল দিছিলাম। সরকার যদি হামার মতো বানভাসির কথা ভাবি, ঈদত কিছু টাকা দিলে ভাল হইল হয়‘- বলেন আমেনা।

হাতিবান্দা দোয়ানি ইউনিয়নের গয়াবাড়ি পর্যন্ত তৈরি আশ্রয়কেন্দ্রটিতে তিস্তার পানিতে ভেসে যাওয়া চর একতার হাট ওচর খড়বাড়ির প্রায় ১০ হাজার বানভাসি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।-বাংলানিউজ২৪

Pin It

Comments are closed.