দলবেঁধে ইট ভাটার কাজে ছুটছে শিক্ষার্থীসহ নিম্নআয়ের লোকজন

আসাদুজ্জামান সাজু :: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ধুবনী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী করিমা আক্তার। এক সপ্তাহ পরে তার বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। অথচ ৬ মাসের জন্য মা-বাবার সাথে ইট ভাটায় কাজ করতে শরীয়তপুর চলে গেছেন। ফলে তার পরীক্ষা দেয়া হচ্ছে না।

এ অবস্থা শুধু করিমা আক্তারের নয়। পরীক্ষা না দিয়ে মা-বাবার সাথে কাজ করতে ঢাকার পথে ছুটছেন করিমা আক্তারের মতো অনেক ছাত্র-ছাত্রী। যে কারণে স্কুল-মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার অনেকটা কমে গেছে।

রোববার সন্ধ্যায় লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা প্রেসক্লাব-হেলিপ্যাড মাঠে দেখা যায়, করিমা আক্তারসহ অন্তত ১০-১২ জন শিক্ষার্থী তাদের মা-বাবার সাথে ইট ভাটায় কাজ করতে গদাগদি করে বাস যোগে বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন। সবাই বসত বাড়ি রেখে পরিবার পরিজনদের নিয়ে গাজীপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, না’গঞ্জ, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ইট ভাটায় যাচ্ছেন দল বেঁধে।

জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বাউরা, নবীনগর, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী, চামটা, চাপারহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকার নিম্নআয়ের লোকজন পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছুটছে ইট ভাটায় কাজ করতে দলবেঁধে।

স্কুল ছাত্রী করিমা আক্তার জানান, এবারের বন্যায় তাদের বসত-বাড়ি নদী গর্ভে চলে গেছে। এখন অন্যের জমি ভাড়া করে বসত-বাড়ি নির্মাণ করে বেঁচে আছে। তার বাবা ইট ভাটার শ্রমিক সর্দারের কাছ থেকে আগাম শ্রম বিক্রি করে ৪০ হাজার টাকা নিয়েছে। আগাম শ্রমের টাকা পরিশোধ করতে মা-বাবার সাথে সেও ইট ভাটায় কাজ করতে যাচ্ছে। পরীক্ষা দিতে খুব ইচ্ছা তার কিন্তু এ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে ইট ভাটায় যেতে হচ্ছে তাকে।

করিমা আক্তারের বাবা ধুবনী গ্রামের বাসিন্দা করিম উল্লাহ ও মা শিউলী বেগম জানান, আমরা দিন মজুর মানুষ। এলাকায় এখন তেমন কোনো কাজ নেই। তাই ৬ মাসের আগাম শ্রম বিক্রি করে টাকা নিয়ে খেয়েছি। এখন ওই টাকা পরিশোধ করতে দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে ইট ভাটায় কাজ করতে যেতে হচ্ছে। ইচ্ছা আছে ছেলে মেয়েকে লেখাপড়া করার কিন্তু উপায় নেই, আমরা গরীব মানুষ। লেখাপড়া আমাদের জন্য নয়।

হাতীবান্ধা উপজেলার চর ধুবনী গ্রামের বাসিন্দা ও শাহ গরিবুল্লাহ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির সুমনা আক্তার জানান, তার মা-বাবা ইট-ভাটায় কাজ করতে গাজীপুর গেছেন। তাদের বাড়িতে এখন কেউ নেই। সে তার ছোট ভাই ৪ বছর বয়সী রুপনকে নিয়ে বাড়িতে আছে। মা-বাবা না থাকায় তাদের খাওয়া দাওয়াতে অসুবিধার পাশাপাশি রাতে ভয় লাগে।

ওই এলাকার সামসুদ্দিন জানান, দিন মজুরী করে তার সংসার চলে। বাইরে কাজ করতে যেতে তার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এবার ইট ভাটার শ্রমিক সর্দারের কাছে আগাম শ্রম বিক্রি করে দিয়ে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিয়েছেন। তাই সেই টাকা পরিশোধ করতে তার স্ত্রী ও ৮ম শ্রেণির মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে ইট-ভাটায় কাজ করতে শরিয়তপুর যাচ্ছেন।

ইট ভাটার শ্রমিক সর্দার সাজু মিয়া জানান, তার অধীনে ৭২ জন শ্রমিক কাজ করতে শরীয়তপুর ইট ভাটায় যাচ্ছে। প্রত্যক শ্রমিক তাদের ৬ মাসের আগাম শ্রম বিক্রি করে দিয়ে জন প্রতি ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। এ ছাড়া তারা নিয়মিত একটা হাজিরা পাবে। তাদের টাকা পরিশোধ হলে আবার বাড়ি ফিরে আসবে।

হাতীবান্ধা উপজেলার দিঘির হাট এলাকার বাস কাউন্টার ম্যানেজার শাহ আলম জানান, গত ২ মাসে তার আওতায় ১৩ টি বাসে প্রায় ৯ শতাধিক শ্রমিক ইট-ভাটায় কাজ করতে বিভিন্ন জেলায় গেছেন। তার হিসাব মতে, চলতি বছর গোটা লালমনিরহাট জেলায় অন্তত ১৩০ টি বাসে ৯ হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক দেশের বিভিন্ন জেলায় ইট ভাটায় কাজ করতে গেছেন। এখনো অনেকেই যাচ্ছে ফলে এ হিসাব আরও বাড়তে পারে।

হাতীবান্ধা উপজেলা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, বিষয়টি শিক্ষা কমিটি’র আলোচনা সভায় উঠে এসেছে। এ নিয়ে স্থানীয় জন প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলা হয়েছে। তারা নিজ নিজ এলাকার শিক্ষার্থীরা যাতে মা-বাবার সাথে কাজ করতে বাইরে না যায় সেজন্য কাজ করছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের হেমভিজিট করতে বলা হয়েছে।

হাতীবান্ধা উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন বাচ্চু জানান, তিস্তা নদীর ভাঙ্গনের কারণে প্রতি বছর হাজারো পরিবার বসত বাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি গৃহহীন পরিবারকে পুর্ণবাসনের চেষ্টা চলছে। তারপরও অনেকই জীবন-জীর্বিকার সন্ধানে পরিবার পরিজনদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন।

এছাড়া এ অঞ্চলের একটি বিশাল অংশ দিনমজুর শ্রেণি। বর্তমান এলাকায় তেমন কোনো কাজ না থাকায় তারা কিছু অতিরিক্ত অর্থের আশায় বাইরে যাচ্ছে। এলাকায় কাজ শুরু হলে তারা আবার ফিরে আসে।

Pin It

Comments are closed.