তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে যাচ্ছেন খালেদা

অনলাইন ডেস্ক: নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি থেকে বিএনপি এবার কৌশলে সরে যাচ্ছে। সব দলের ঐকমত্যে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে এখন নিরপেক্ষ নির্বাচনে ‘সহায়ক’ সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে চায় দলটি।

গত ১৮ নভেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনেও এমন আভাস দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওই সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি প্রধান বলেন, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যতিরেকে সুষ্ঠু অবাধ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন যাতে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন জাতিকে উপহার দিতে পারে— সেই উদ্দেশ্যেই একটি ‘নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সহায়ক’ সরকারের প্রয়োজন। আমরা নির্বাচনকালীন সেই সহায়ক সরকারের রূপরেখা ভবিষ্যতে যথাসময়ে জাতির সামনে তুলে ধরব। জানা যায়, সংবাদ সম্মেলনে বেগম জিয়ার সহায়ক সরকার নিয়েও দলের ভিতরে-বাইরে চলছে নানা আলোচনা।

অন্যান্য রাজনৈতিক দলেও এ নিয়ে চলছে নানা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। নতুন সহায়ক সরকারের রূপরেখা কেমন হবে—তা নিয়েও জানার আগ্রহ অনেকের। তবে এ নিয়ে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা কাজ করছেন বলে জানা গেছে। তবে ওই রূপরেখা সম্পর্কে কেউই এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না। খুব শিগগিরই আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা তুলে ধরবেন বেগম জিয়া।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তখনকার মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিলে তা প্রত?্যাখ?্যান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব?্যবস্থা ফেরানোর দাবিতে আন্দোলন করে বিএনপি। তার পরিবর্তে ২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর একজন ‘সম্মানিত নাগরিকের’ নেতৃত্বে সাবেক ১০ জন উপদেষ্টাকে নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পাল্টা প্রস্তাব দেন তৎকালীন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিনিধি তারানকোর দূতিয়ালিতেও সে সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমঝোতা হয়নি। শেখ হাসিনা জাতীয় পার্টিসহ তার পুরনো শরিকদের কয়েকজনকে মন্ত্রিসভায় এনে ২০১৩ সালের শেষের দিকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেন। সেই সরকারের অধীনেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় নির্বাচন হয়। বিএনপি ও শরিকদের বর্জনের ম?েধ্য টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থার অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন চাই। সেই সরকারকে সর্বাত্মকভাবে নির্বাচন পরিচালনার মাধ্যমে সহযোগিতা করবে একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য এই ইসি গঠনের ব্যাপারে আমাদের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একটি প্রস্তাবনা দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিরপেক্ষ নির্বাচনে সহায়ক একটি সরকারের কথাও বলেছেন। সংকট নিরসনে আশা করি সেই প্রস্তাবকে ভিত্তি করে সরকার অবিলম্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা বা সংলাপের ব্যবস্থা করবে।’

বিএনপির নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, ‘তত্ত্বাবধায়ক’ শব্দটি এখন আর বিএনপির কাছে মুখ্য বিষয় নয়। নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা গ্রহণ করাই সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে বিএনপিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে পুরোপুরি সরে আসবে। সেক্ষেত্রে সংবিধানের ভিতর থেকেই সর্বদলীয় সরকারও গঠন করা যেতে পারে।

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করার পরও একই দাবিতে আন্দোলন করেছে বিএনপি। এমনকি সে নির্বাচনের পর এক বছরের মাথায় বিএনপি চেয়ারপারসনের ডাকে ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে টানা তিন মাস একই দাবিতে সারা দেশে ‘হরতাল-অবরোধ’ কর্মসূচি পালন করে দলটি। সেই হরতাল-অবরোধকে কেন্দ্র করে সারা দেশে অন্তত কয়েকশ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এতকিছুর পর গত ১৮ নভেম্বর নতুন ইসি গঠন সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ শব্দটি এড়িয়ে গিয়ে ভবিষ?্যতে এ বিষয়ে আবার সাংবাদিকদের সামনে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন বেগম জিয়া।

গত বছর ২৫ জুলাই নিজের কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায়ও বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছিলেন, আমি বলব না যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। যে নামেই হোক না কেন, একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আমরা দেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন চাই। বেগম খালেদা জিয়ার সেই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক সংকট’ থেকে উত্তরণে ‘ম্যাডামের’ এক কদম অগ্রসর হওয়া বলেও মন্তব্য করেছিলেন বিএনপি সমর্থক কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ।

এ প্রসঙ্গে ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সরকারের নাম যা-ই হোক না কেন, কাজটা যদি শতভাগ নিরপেক্ষ হয়— অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনটা যদি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায় এবং ভোটের ফলাফলে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়, তাহলেই হলো।

একই অভিমত ব্যক্ত করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি বলেন, নাম হোক যা-খুশি, কর্ম হোক ভালো। ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নামটা-ই যে থাকতে হবে, তার কোনো মানে নেই। আলোচনা সাপেক্ষে অন্য যে কোনো নামই দেওয়া যেতে পারে। তবে সরকারটা হতে হবে নির্দলীয় এবং কাজটা হতে হবে নিরপেক্ষ। যাদের অধীনে ৫ জানুয়ারির মতো তামাশার নির্বাচন নয়, বরং সত্যিকারের একটি নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এদেশে। বিএনপির একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনকালীন প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার মাধ্যমে সর্বদলীয় সরকারের অধীনেও নির্বাচনে যেতেও আপত্তি নেই বিএনপির। তবে সরকারকেও ছাড় দিতে হবে। বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। নেতাদের মামলা প্রত্যাহারসহ সব ধরনের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করতে হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Pin It

Comments are closed.