কে কাকে সান্ত্বনা দেবে!

অনলাইন ডেস্ক :: রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় শনিবার (২৪ জুন) সকালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৭ জনের মধ্যে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নেরই ১০ জন। নিহত ও আহতদের পরিবারের আহাজারিতে চারদিকের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে। যেন গোটা চন্দ্রপুর ইউনিয়নই শোকাহত। একই দুর্ঘটনায় আদিতমারী উপজেলার দুইজন মারা গেছেন।

নিহতদের মধ্যে সাদ্দাম হোসেন (২৯) ও তার ছোট ভাই আলমগীর হোসেনের (২৬) বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের লতাবর এলাকায়। এ দুর্ঘটনায় সাদ্দামের স্ত্রী শরিফা খাতুন ও আলমগীরের স্ত্রী খাদিজা খাতুন আহত হন। ওই ট্রাকে থাকা শরিফা খাতুনের ভাই দেলোয়ার হোসেনও নিহত হয়েছেন।

শনিবার দুপুরে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই ছেলের শোকে কাতর মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। এসময় তিনি বিলাপ করে বলছিলেন, শুক্রবার বিকালে তার ছেলে সাদ্দাম ও ছেলের বউ শরিফার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়। সেসময় তারা তাকে জানিয়ে ছিলেন, আল্লাহ সহি সালামতে বাড়িতে নিলে শনিবার এক সঙ্গে বসে ইফতার করবেন। কিন্তু তাদের সে আশা আশাই থেকে গেল। এসময় দাদীর পাশেই ছিলেন দুর্ঘটনায় নিহত সাদ্দামের একমাত্র কন্যা শারমিন আক্তার সাথী (৬)। সে কিছু বুঝতে না পারলেও দাদীর কান্না দেখে সেও মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে। অন্যদিকে আরেক ছেলে আলমগীরের দুই বছরের শিশু কন্যা আঁখি মনির কান্নাও কেউ থামাতেই পারছিলেন না।

প্রতিবেশী রবিউল ইসলাম (৪০) বলেন, নিহত দুই ভাইয়ের বাবা আইয়ুব আলী মসজিদে এতেকাফ নিযুক্ত থাকায় তিনি বাড়িতে না আসার কথা জানিয়েছেন। তিনি মসজিদ থেকেই ছেলেদের জন্য দোয়া করবেন।
এদিকে, কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের অপর এলাকা উত্তরবত্রিশ হাজারী। এ এলাকায় একই পরিবারের চাচাতো ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। ছয়জন আহত হয়েছেন। এরমধ্যে উত্তরবত্রিশ হাজারী এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে রবিউল ইসলাম মজনু নিহত হন। জাহাঙ্গীরের ভাই ঝন্টু মিয়ার মেয়ে সুবর্ণা বেগম (৯) মারা গেছেন। আহত হয়েছেন নিহত রবিউলের ভাই মতিউল ইসলাম মতি, তার চাচা ঝন্টু মিয়া, ঝন্টু মিয়ার স্ত্রী জামিনা বেগম, ঝন্টুর অপর মেয়ে ঝরনা বেগম। ঝন্টুর মামাতো ভাই নুর নবী। এ ইউনিয়নের উত্তর বত্রিশ হাজারী এলাকা থেকে কিছুদুর গেলে টাওয়ার মার্কেট। সেখানেও নিহত হয়েছেন দুইজন। একই ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকায়ও মারা গেছেন একজন।

নিহত রবিউলের বাবা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঢাকায় জুতা ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ছিল দুই ছেলে। এলাকার অন্যান্যদের সঙ্গে একযোগে ট্রাকে ঈদ করার জন্য বাড়িতে আসছিল। এমন ঘটনায় আমার সন্তান মারা যাবে বিশ্বাসই করতে পারছি না।

কালীগঞ্জ উপজেলার চাপারাহাট এলাকার ট্রাক চালক আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদের সময় ঢাকা থেকে বিভিন্ন যাত্রী ট্রাকেও আসে। স্থানীয় ট্রাক ও চালক হওয়ায় এলাকার লোকজন কথা বলে ওই গাড়িতে আসতেছিল। কিন্তু দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে তারা মারা গেল।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দিন খান বলেন, ‘কালীগঞ্জ উজেলা নির্বাহী অফিসার শাহীনুর আলম ঘটনাস্থলে যান। নিহতদের লাশ নিয়ে সন্ধ্যা ৬টায় তিনি ফেরেন। পরে চন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার, লাশ দাফনের খরচ ও আহতদের চিকিৎসার জন্য প্রত্যেককে ৫ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে।’

লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক বলেন, ‘শোকাহত পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় নিয়ে লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেকোনও ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে জেলাজুড়ে পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ বাংলাট্রিবিউন

Pin It

Comments are closed.