কাঁদলেন-কাঁদালেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৫ আগস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন। এদিন ব্যক্তিগতভাবে আমি হারিয়েছি আমার মা, বাবা, ভাইসহ স্বজনদের। আর জাতি হারিয়েছে তার ভবিষ্যত। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ১০ বছরের আমার ছোট্ট ভাই রাসেল কি অপরাধ করেছিল? জন্মের পর থেকে সে বাবার স্নেহ পায়নি। আমি খুঁজে পাই না, কেন এই হত্যাকান্ড? কী অপরাধ ছিল আমার মায়ের। আসলে যারা এদেশের স্বাধীনতা চায়নি, মুক্তিযুদ্ধে বিজয় চায়নি, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল- সেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪১তম শাহাদত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে খামারবাড়িস্থ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। প্রায় পৌনে এক ঘন্টার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ১৫ আগস্টের আগে ও পরের ঘটনাবলী এবং সব হারানোর ব্যাথা-বেদনার কথা বলতে গিয়ে বার বার আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন। বারবার তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তার বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। পুরো বক্তব্যের সময়ই ছিল পিনপতন নিরবতা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে এবং কাঁদতে দেখে হলভর্তি নেতা-কর্মীরাও নিজেদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। অনেককে রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছতে দেখা যায়।
১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন না করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কাল (সোমবার) শুনলাম উনি যে কেক কাটবেন না। এটাকে অনেকে রাজনৈতিক উদারতা হিসাবে দেখাতে চাচ্ছেন। আসল ঘটনা হচ্ছে ১২ আগস্ট তার ছেলে কোকোর জন্মদিন। আর কোকোর জন্মদিন যেহেতু করতে পারবেন না, সে মারা গেছে। কাজেই নিজেরটা করবেন না, এটাই হলো বাস্তব কথা।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকাঙ্খা পূরণই আমার একমাত্র প্রতিজ্ঞা। এ জন্য সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ১৫ আগস্টের পর থেকে এই দেশ ২১ বছর শোষিত নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়েছে। আমি সব হারিয়েছি। কিন্তু সব হারাবার বেদনা নিয়েও একটা শক্তি নিয়ে কাজ করি বড় সন্তান হিসেবে। এই দেশকে নিয়ে, দেশের মানুষগুলোকে নিয়ে। আমার বাবার যে স্বপ্নগুলো ছিল তা জানার এবং বোঝার সুযোগও আমার হয়েছিল। শুধু একটা কথাই মনে করি, এই কাজগুলো করলে, দেশের মানুষগুলো ভাল থাকলে, আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে।

শোকাবহ দিনের ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র ১৫ দিন আগে ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই দ্বিধা-দ্বন্ধ নিয়ে স্বামীর কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য দেশ ছেড়েছিলাম। জানি না কেন সেদিন মায়ের কি আকুল কান্না, আজও ভুলতে পারি না। মাকে এভাবে কান্না করতে কখনও দেখিনি। জানিনা মা হয়ত সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন এটাই আমাদের শেষ দেখা। তাই হয়ত এত কাঁদছিলেন। তিনি বলেন, ১৩ আগস্ট মায়ের সঙ্গে আমার টেলিফোনে শেষ কথা হয়। তখন মা আমাকে বলেছিলেন- তুই আয়, তোর সঙ্গে অনেক কথা আছে। মায়ের সেই কথা আর শোনা হয়নি। আর বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয় ১৪ আগস্ট। শেখ হাসিনা বলেন, ১৫ আগস্ট ভয়াল রাত্রির কথা যুগোশ্লোভিয়া থেকে শোনা যায় যে, বাংলাদেশে ক্যু হয়েছে। তখন আমি আর্তনাদ করে উঠি তবে কী আমাদের কেউ বেঁচে নেই? তখনও জানতে পারিনি দেশে ঠিক হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সাল থেকে ৮১ পর্যন্ত ভারতেই ছিলাম। এর মধ্যে লন্ডনে শেখ রেহানার বিয়ে ঠিক হলো। কিন্তু বিমানের টিকিট কেটে বোনের বিয়েতে যাওয়ারও কোন সামর্থ্য ছিল না। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বেঁচে থাকা একটিমাত্র বোনের বিয়েতেও যেতে পারিনি। কারণ সেসময় টিকিটের টাকা, সেখানে থাকা-খাওয়ার সুযোগ আমাদের ছিল না। আমি একমাত্র বোন হয়েও তাঁর বিয়েতে থাকতে পারি নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসলাম, লাখো মানুষের ঢল। বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে এলাম। মুষলধারে বৃষ্টি-ঝড়। ৩০ জুলাই যখন বিদেশে যাই তখন বিমানবন্দরে মাসহ শেখ জামাল, শেখ কামাল, শেখ রাসেলসহ পরিবারের সবাই ছিল। ৮১ সালের ১৭ মে যখন ফিরে আসি লাখো মানুষ ছিল, কিন্তু মা, বাবা, ভাই কাউকে পাইনি। লাখো মানুষের মাঝেই খুঁজে-ফিরি আমার পরিবারের সদস্যদের। পরিবারের সবাইকে হারালেও দেশে ফিরে দলের অসংখ্য মানুষের ভালবাসা ও সমর্থন পেয়েছিলাম। দেশে ফিরলেও জিয়াউর রহমান তাঁকে ৩২ নম্বরের বাসভবনে প্রবেশ করতে দেয়নি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৮১ সালে বিমানবন্দর থেকে ৩২ নম্বরের বাড়িতে আসি। কিন্তু আমাকে ঢুকতে দেয়নি। জিয়ারউর রহমান ওই বাড়ি আমার জন্যে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। বড় তালা ঝুলানো ছিল। পরে ৩২ নম্বরের বাড়ি সামনে রাস্তায় মিলাদ, দোয়া ও মোনাজাত করে ফিরে আসি। জিয়া যতদিন বেঁচে ছিলেন, ওই বাড়িতে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। অবশ্য জিয়া আমাকে অনেক বাড়ি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি নেইনি। আমি বলেছিলাম- খুনীর কাছ থেকে আমি কোন সুযোগ নেব না। এরআগে আমি যখন ভারতে, লন্ডনে ছিলাম জিয়া সফরে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। আমি সাফ বলেছি, খুনীর চেহারা দেখতে চাই না।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার করেছি, বিচারের রায় কার্যকর করেছি। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, গ্রেনেড হামলা, জঙ্গী-সন্ত্রাসবাদ, ষড়যন্ত্র অনেক কিছুই মোকাবেলা করেই আমরা দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এখন একটাই কাজ দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। যে দুঃখী মানুষের জন্যে আমার বাবা, মা, ভাইরা রক্ত দিয়েছেন, সেই দুঃখী মানুষের ভাগ্য বদল করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য ও শপথ। ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে আমরা দেশকে গড়ে তুলবোই-শোক দিবসে এটিই হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা। পিতা তোমাই কথা দিলাম- দেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবোই ইনশাল্লাহ।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে কবিতা আবৃত্তি করেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। অনুষ্ঠান পরিচালনা রেন প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।-ইত্তেফাক

Pin It

Comments are closed.