কতটা নিরাপদ প্যারাসিটামল?

হাতব্যাগ, ড্রয়ার বা হাতের কাছেই ওষুধ রাখার পাত্রে খুঁজলে হয়তো সবার কাছেই পাওয়া যাবে প্যারাসিটামল। জ্বর হোক বা মাথা ব্যথা, একটু সর্দি ঝরল বা গলা ব্যথা হলো কিংবা পা মচকে গেল, এমনকি দাঁতে তীব্র ব্যথা হলেও হাতের কাছে থাকা এ প্যারাসিটামলই প্রাথমিক ভরসা। কিন্তু নিরাপদ বলে আপাতত বিবেচিত ওষুধটি আসলে কতটা নিরাপদ! লিখেছেন ল্যাবএইড গুলশানের চিফ মেডিসিন কনসালট্যান্ট ও আশিয়ান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকার মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জুলহাস উদ্দিন

 

সাধারণের কাছে ওষুধটি নিরাপদ বলেই বিবেচিত। যদিও কয়েক বছর আগে আমাদের দেশে প্যারাসিটামল সিরাপের বিষক্রিয়ায় কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও আছে। আর কয়েক মাস আগে প্যারাসিটামলের সঙ্গে অন্য একটি ওষুধের সংমিশ্রণে তৈরি ওষুধগুলোও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়েছে। প্যারাসিটামল ওষুধটি শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই কোনো ধরনের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায়। মূলত ব্যথানাশক হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়।

প্যারাসিটামল অ্যাসিটামিনোফেন নামেও পরিচিত। মাথা ব্যথা, গা ব্যথা, দাঁত ব্যথা, মাসিকের ব্যথা, সর্দি, গলা ব্যথা, আর্থ্রাইটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, জ্বরসহ বহু অবস্থায় ওষুধটি ব্যাপক ও যথেচ্ছভাবে ব্যবহৃত হয়। আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি সপ্তাহে মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ বা পাঁচ কোটি মানুষ প্যারাসিটামল সেবন করে।

ব্যথানাশক হলেও অন্যান্য ব্যথানাশকের  (এনএসএআইডি) মতো পাকস্থলী বা হার্টে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। অনেক ক্ষেত্রে যখন অন্য ধরনের ব্যথানাশক রোগীর জন্য নিরাপদ বিবেচনা করা হয় না, তখন প্যারাসিটামলই ভরসা হিসেবে কাজ করে। যেমন—গর্ভকালীন। ফার্স্ট ট্রাইমস্টার বা প্রথম তিন মাসেও প্যারাসিটামল সেবনে গর্ভস্থ শিশুর বিকলাঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায় না; কিন্তু কিছু গবেষণায় আবার এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা দেখে ওষুধটি আর আগের মতো নিরাপদ ভাবার কারণ নেই। গত বছর অ্যানালস অব দ্য রিউম্যাটিক ডিজিজ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, প্যারাসিটামল হার্টের অসুখের ঝুঁকি বাড়ায় এবং কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুরও কারণ ঘটায়।

 

লিভারের ক্ষতি

প্যারাসিটামলে যে লিভার বা যকৃতের ক্ষতি হয়, তা আগেই জানা গিয়েছিল। সে জন্য ডিএল মিথিওনিন যুক্ত করে নিরাপদ প্যারাসিটামল বাজারে ছাড়া হয়েছিল। তখন দেখা গেল, ডিএল মিথিওনিন উপকারের চেয়ে ক্ষতি করছে অনেক বেশি। তাই ওষুধটি বিশ্বজুড়েই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে ২০০০ সালের আগেই। বাংলাদেশে অবশ্য মাত্র এক বছর আগে এটি বন্ধ করা হয়েছে। প্যারাসিটামল সেবন করলে তা লিভারে গিয়ে মেটাবলিজম বা বিপাক হয়। ব্যবহৃত উপাদানগুলো বাদে বাকি অংশ প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়; কিন্তু মেটাবলিজম হওয়ার সময়ই কিছু উপাদান টক্সিন বা বিষে পরিণত হয় এবং লিভারের কোষকে ধ্বংস করতে পারে। যত বেশি প্যারাসিটামল সেবন করা হবে, তত বেশি লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ডোজ স্বাভাবিকের মাত্রা অতিক্রম করলে লিভার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে রোগী মারাও যেতে পারে। অ্যাকিউট লিভার ফেইলিওরের অন্যতম বড় কারণ প্যারাসিটামল ওভারডোজ। ছোট্ট একটি পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। ১৯৯০ থেকে পরবর্তী ১০ বছরে শুধু আমেরিকায় প্যারাসিটামলজনিত লিভারের অসুখে ২৬ হাজার জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এবং এর মধ্যে সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। মূলত এ জটিলতা হয়েছিল—যারা ডোজ নিয়ন্ত্রণ করে সেবন করেনি তাদের ক্ষেত্রে।

সাধারণত একটি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ৫০০ মিলি গ্রামের হয়। শুধু ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ আটটি এ মাত্রার প্যারাসিটামল সেবন করা যায়। লিভারের অসুখ এক দিন অতিরিক্ত ডোজ সেবন করলেই হতে পারে। তা ছাড়া প্রায়ই যদি নানা কারণে প্যারাসিটামল সেবন করা হয়, তাহলেও ধীরে ধীরে লিভারের কিছু কিছু ক্ষতি হয়।

 

ত্বকের অ্যালার্জি ও রক্তের ক্যান্সার

ত্বকের অ্যালার্জির সঙ্গে প্যারাসিটামলের সম্পর্ক আছে। কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের অ্যালার্জি-রোগীর মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। মারাত্মক ধরনের অ্যালার্জির মধ্যে আছে স্টিভেন জনসন সিনড্রোম বা এসজেএস, টক্সিক অ্যাপিডার্মাল নেকরোলাইসিস। কিন্তু তার চেয়েও ভয়ের কথা, রক্তের কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে প্যারাসিটামল সেবন। জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্যারাসিটামল সেবনের সঙ্গে রক্তের কিছু ক্যান্সার বা ব্লাড ক্যান্সারের সম্পর্ক আছে, বিশেষ করে লিম্ফোমা ও লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে। এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল ৬৪ হাজার মানুষের

ওপর।

 

অ্যাজমা, অটিজম, এডিএইচডি

গর্ভকালীন প্যারাসিটামল সেবনে গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটি হয় না; কিন্তু অন্য ধরনের ক্ষতি হতে পারে। সম্প্রতি নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ পরিচালিত এক গবেষণায় এ-সংক্রান্ত কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন—গর্ভকালীন প্যারাসিটামল সেবনে অ্যাজমার প্রকোপ বাড়ে। শ্বাসকষ্ট বেশি হয়। এমনকি অনাগত সন্তানের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। অতিরিক্ত চঞ্চলতাজনিত অসুখ বা মনোযোগ ঘাটতিজনিত অসুখ বা এডিএইচডিও বেশি হয় গর্ভকালীন প্যারাসিটামল সেবনে। স্পেনে পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভকালীন প্যারাসিটামল সেবন করলে গর্ভস্থ ছেলেশিশু অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

 

তাহলে?

প্যারাসিটামল সেবন বাদ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণ করা বা অতিরিক্ত সেবন না করার কথা বলা হচ্ছে। সতর্কতা হিসেবে মনে রাখতে হবে কিছু কথা।

►        প্যারাসিটামল আছে এমন ওষুধ একসঙ্গে একাধিক সেবন করবেন না।

►        নিয়মিত প্যারাসিটামল সেবন করতে হয় এমন অবস্থা হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

►        কোনো অবস্থায়ই দিনে আটটি বা তার বেশি প্যারাসিটামল (৪০০০ মিলিগ্রাম) সেবন করবেন না।

►        আগে থেকেই যাঁদের লিভারের অসুখ আছে, তাঁরা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল সেবন করবেন না। লিভারের অসুখ আছে—এ তথ্যটি ডাক্তারকে জানান।

►        অ্যালকোহল সেবন করলে প্যারাসিটামল নেওয়া যাবে না।

►        গর্ভকালীন যখন-তখন প্যারাসিটামল সেবন করবেন না।

►        তিন দিনের বেশি হয়ে গেছে অথচ জ্বর ছাড়ছে না—এমন ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল সেবন না করা ভালো।

সূত্র: কালেরকন্ঠ

Pin It

Comments are closed.