এই সিথি সেই সিথি

পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে সহকারী কেন্দ্রসচিবের ওএমআর শিট জালিয়াতির কারণে এসএসসিতে বিজ্ঞানে ফল বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল মেধাবী ছাত্রী সিথি কিবরিয়া। এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের দীর্ঘ তদন্তের পর ন্যায্য ফল ‘গোল্ডেন জিপিএ ৫’ পায় সে। কিন্তু তত দিনে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় এইচএসসিতে মানবিক বিভাগ নিয়েই পড়তে হয় তাকে। সেই সিথি গতকাল বৃহসপতিবার প্রকাশিত এইচএসসির ফলে মানবিক বিভাগেও ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পেয়েছে। পুরো হাতীবান্ধা উপজেলাতেই এবার মানবিকে একমাত্র ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পাওয়া শিক্ষার্থী সে।

জানা গেছে, এইচএসসি পরীক্ষা মানবিক বিভাগে মোট ১৩০০ নম্বরের পরীক্ষায় সিথি পেয়েছে ১১৪১ নম্বর। একসময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছাত্রীর এই ফলকে শিক্ষক ও বোর্ড কর্মকর্তারা ঈর্ষণীয় সাফল্য বলে অভিহিত করেছেন। সিথি এবার হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।

সিথির এইচএসসির পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল হাতীবান্ধা মহিলা ডিগ্রি কলেজে (হাতীবান্ধা পরীক্ষা কেন্দ্র-২)। হাতীবান্ধা মহিলা ডিগ্রি কলেজ অধ্যক্ষ শামসুল হক ও পরীক্ষা কেন্দ্র-১ আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সারওয়ার হায়াত খান সিথির পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর এবং উপজেলায় মানবিক বিভাগে একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে সব বিষয়ে জিপিএ ৫ (গোল্ডেন এ প্লাস) পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা, দৈনিক সংবাদ ও বাংলাদেশ বেতারের সাংবাদিক এবং হাতীবান্ধা আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক আলী আখতার গোলাম কিবরিয়ার একমাত্র মেয়ে সিথি কিবরিয়া। ২০১৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ওএমআর শিট জালিয়াতির মাধ্যমে জেলার সেরা মেধাবী শিক্ষার্থী সিথির সর্বনাশ ঘটানো হয়েছিল। এসএসসিতে সে শুধু ‘এ’ গ্রেড পেয়েছিল। দেখা গেছে, সিথি অন্যান্য বিষয়ে এ প্লাস গ্রেড পেলেও বাংলা, সমাজবিজ্ঞান, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা—এ চারটি বিষয়ে এ গ্রেড পায়।

পরে এই চারটি বিষয়ের ওএমআর তদন্তের জন্য ২০১৪ সালের ১৭ জুন দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে উচ্চতর নিরীক্ষণের জন্য লিখিত আবেদন জানায় সিথি কিবরিয়া। দুই দফা তদন্তে প্রমাণিত হয়, সিথির ওই চারটি বিষয়ের ওএমআর শিট পরীক্ষাকেন্দ্রেই গায়েব করা হয়েছিল। গায়েব করার পর ওএমআর শিটের পরিবর্তন ঘটিয়ে চারটি নতুন ওএমআর শিট উদ্দেশ্যমূলকভাবে পূরণ করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, যাতে সিথির ফল ভালো না হয়। অবশেষে সিথির গোল্ডেন এ প্লাস উদ্ধার হয়। একই সঙ্গে বোর্ডের সব পরীক্ষার কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয় ষড়যন্ত্রকারী শিক্ষক মাহাতাবউদ্দিনসহ সাত শিক্ষককে।

জানা গেছে, পারিবারিক দ্বন্দ্বের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে এই অপকর্ম করেছিলেন হাতীবান্ধা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক ও ওই পরীক্ষাকেন্দ্রের সহকারী কেন্দ্রসচিব মাহাতাবউদ্দিন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সিথির মা একসময় স্থানীয় সিঙ্গিমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে বিদ্যালয় থেকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত হরা হয়েছিল। বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন সেই মাহাতাবউদ্দিন। তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সিথির মায়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সেই থেকে দুই পারিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব বিরাজ করতে থাকে। সেই দ্বন্দ্বের জের ধরে এসএসসি পরীক্ষার সহকারী কেন্দ্রসচিব মাহাতাবউদ্দিন সিথির ওএমআর শিট ঘষামাজা করেন, যা দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের তদন্তে প্রমাণিত হয়। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে অবশেষে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে বোর্ডের সংশোধিত ফলাফলে সিথি সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ ৫ পায়।

জানা গেছে, সিথি প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বরাবরই প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থী ছিল। এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায়ও শাহ্ গরীবুল্যাহ্ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সব বিষয়ে এ প্লাস পেয়েছিল। সিথি পঞ্চম শ্রেণির পিএসসি ও অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে জেলায় প্রথম হয়েছিল। গণিত অলিম্পিয়াডে জেলা চ্যাম্পিয়ন হয় সিথি কিবরিয়া। সে বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পীও। হাতীবান্ধা শাহ্ গরীবুল্যাহ্ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষার্থী সিথি কিবরিয়া শিক্ষক মাহাতাবউদ্দিনের চক্রান্তে এসএসসিতে এ প্লাস পায়নি, পেয়েছিল শুধু এ গ্রেড। অথচ এ প্লাস পেয়েছিল ওই বিদ্যালয়ে ওর পেছনের ৪৯ শিক্ষার্থী। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্রী সিথি কিবরিয়া শেষ পর্যন্ত একাদশ বিজ্ঞানে আর ভর্তি হতে পারেনি। কারণ সংশোধিত ফল প্রকাশের আগেই ভর্তির সুযোগ চলে যায়। সে বাধ্য হয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়।

অনেক বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত এবার এইচএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ ৫ পেল সিথি কিবরিয়া। একসময় চিকিৎসক হতে চাওয়া সেই সিথি এখন বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। সে আইনে পড়াশোনা করতে চায়। গতকাল প্রকাশিত এইচএসসির ফলে খুশি সিথি কিবরিয়া কালের কণ্ঠকে বলে, ‘এই ফলাফলেই আবার প্রমাণ করলাম এসএসসিতে শত্রুতার জের ধরে আমার ফল খারাপ হয়েছিল।’ এ জন্য সে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি ও কালের কণ্ঠ’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

সিথির মা মাসুদা আখতার কল্পনা বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বেরিয়ে এইচএসসিতে ঈর্ষান্বিত ফল করে সিথি প্রমাণ করল সে মেধাবী।’ তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ষড়যন্ত্রের কারণে ভেঙে গেলেও এখন বিচারক হওয়ার স্বপ্ন যেন পূরণ হয় সে জন্য সবার দোয়া চেয়েছেন তিনি।

Pin It

Comments are closed.