‘অবৈধ বাংলাদেশি’ জমি দখলদার হঠাবে আসাম

 

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম সরকার বলছে কয়েক লক্ষ দখলদারকে তারা সরকারি খাস জমি বা দেবোত্তর জমিগুলি থেকে সরিয়ে দিতে চলেছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে এই দখলদারদের অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে মন্তব্য করছেন ক্ষমতাসীন বি জে পি নেতারা।

তবে অনুপ্রবেশ বিরোধী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দাবী করছে ওই দখলদারেরা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী-ই, যারা হাজার হাজার বিঘা সরকারি আর দেবোত্তর জমি দখল করে নিয়েছেন। বিরোধীরা বলছে বাংলাভাষী মুসলমান বলেই অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে উৎখাত করার চেষ্টা করছে সরকার।

সরকার বলছে, গোটা আসামে খাস জমি আর বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের উপাসনাগৃহ বা সূত্রগুলির হাজার হাজার বিঘা জমি দখল হয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্রের চরের ভাঙ্গনের ফলে সেইসব জায়গা থেকে এসে মানুষ এই সরকারি আর দেবোত্তর জমিগুলো দখল করেছেন কয়েক লক্ষ মানুষ।

রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী বিবিসিকে জানিয়েছেন, এই কয়েক লাখ মানুষকে হঠাতেই হবে সরকারি জমি আর দখল হয়ে যাওয়া বৈষ্ণব সত্রগুলির জমি থেকে।

প্রথমেই টার্গেট করা হয়েছে দুটো জায়গাকে – একটা মরিগাঁও জেলার মায়াং আর অন্যটা দরংয়ের শিপাঝাড়।

মরিগাঁওয়ের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১৯৯৮ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙ্গনের পর থেকে সেখানে চরের মানুষ বাসা বাঁধতে শুরু করেন – পরে ধীরে ধীরে সংখ্যাটা বেড়েছে।

আবার অন্যদিকে শিপাঝাড়ে প্রায় ২৫০০০ মানুষ সামাজিক চারণভূমিতে বসবাস করতে শুরু করেছেন বলে দাবী করছে অনুপ্রবেশ বিরোধী একটি সংগঠন।

সরকার বলছে, এই দুটো দিয়ে শুরু করে তারপরে গোটা রাজ্যের সব দখলীকৃত জমিই উদ্ধার করতে তারা বদ্ধপরিকর।

লক্ষণীয় বিষয়, রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে এঁদের অবৈধ দখলদার বলছেন। তিনি জানাচ্ছেন যতক্ষণ না জাতীয় নাগরিক পঞ্জি হালনাগাদ হচ্ছে, ততক্ষণ কাউকে অবৈধভাবে আসা বাংলাদেশি বলতে পারে না সরকার।

কিন্তু মরিগাঁও জেলা থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি – যার এলাকায় দখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধার করা শুরু হচ্ছে, সেই বি জে পি বিধায়ক রমাকান্ত দেউরি এই দখলদারদের অবৈধ বাংলাদেশি বলেই একাধিকবার উল্লেখ করলেন বিবিসি-র সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে।

অনুপ্রবেশ বিরোধী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন – পরিবাজন বিরোধী মঞ্চ মাঠ পর্যায়ে তদন্ত চালিয়েছে এই দুটি জায়গাতেই।

সংগঠনটির কর্মকর্তা আকাশ কলিতা জানিয়েছেন যে একেবারে গোড়ায় যারা এসেছিলেন, তাঁরা হয়তো চরের মানুষ – বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ। কিন্তু একরাতে কখনও ৫০০ কখনও ২০০ ঘর তৈরি করে যারা বসতি বানিয়েছেন তাঁরা অবৈধভাবে আসা বাংলাদেশি-ই।

এই দখলদারদের জন্য স্থানীয় অসমীয়া মানুষরা – বিশেষত নারীরা নিয়মিত হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বলেও তদন্তে জানতে পেরেছেন মি. কলিতা।

তিনি আরও বলছিলেন যে ভারতীয় ভোটার কার্ড জালিয়াতি করে বার করাটা কোনও সমস্যাই নয়।

বিরোধীদলগুলো অবশ্য সরকারের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। আসাম বিধানসভায় দিন কয়েক আগে এ নিয়ে তুমুল হট্টগোল হয়েছে।

বরপেটা জেলার এক কংগ্রেস বিধায়ক শেরমান আলি আহমেদ বিবিসিকে বলেন, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙ্গনের ফলে চর থেকে মানুষ গিয়ে সরকারী জমিতে বাসা বেঁধেছে। এঁদের কখনই অবৈধ বাংলাদেশি বলা যায় না। এঁদের সকলের কাছেই ভারতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে। আর বারে বারে দাবী তোলা সত্ত্বেও চরের মানুষদের জমির অধিকার দেওয়া হয় নি এখনও, সেজন্যই চর ভাঙ্গলে মানুষ সরকারী খাস জমিতে বাস করছেন।

আসামের আরেক বাংলাভাষী মুসলমান রাজনৈতিক নেতা হাফিজ রশিদ চৌধুরী বলছেন কেউ অনুপ্রবেশকারী না ভারতীয় মুসলমান, সেটা তো ঠিক করবে বিদেশী ট্রাইব্যুনাল – সরকার কীভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যে এই দখলদারেরা অবৈধ বাংলাদেশি!

তবে বিরোধীরা এটাও বলছেন যদি কোনও অবৈধ বাংলাদেশি থেকে থাকেন, তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়াতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু আসামের স্থায়ী বাসিন্দা যারা সেইসব মুসলমানকে কেন হেনস্থা করা হবে!-বিবিসি বাংলা

Pin It

Comments are closed.